Tuesday, June 3, 2014

বিদায় বন্ধু, বিদায়...

“অপুদা, তোমাকে একটা গ্রুপে জয়েন করার জন্য রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছি, পারলে একবার দেখ”আমার থাকা তখন বাঙ্গালোরে আর সময়টা  সম্ভবত দুই হাজার দশ সালের মাঝামাঝি। আমি “ঠিক আছে” বলে ফোন টা রেখে দেই। ফেসবুকের জগতে আমার বয়স তখন দেড় কি দুই হবে আর ইহ জগতের বয়স নাই বা বললাম। যাই হোক টানা পাঁচদিনের কর্ম ব্যস্ততার পর উইকেন্ডের এক বিরাট অংশ থাকত ফেসবুকের নামে। উইক ডেজ গুলোতে যে থাকত না এমন না, খুবই কম আর তাই সপ্তাহের ওই ছুটির দুদিন যেন একেবারে ওয়কফ থাকত ফেসবুকের জন্য।
“বন্ধু, এ সোসিও লিটারারি গ্রুপ”, জাহিরের পাঠানো গ্রুপটার নাম দেখে বেশ ভালই লাগলো। অনেক ধরণের গ্রুপের ছড়াছড়ি তখন ফেসবুকে, তাই জাহিরের সেদিনের ফোনে আমার তখন ততটা উৎফুল্লতা আসেনি যতটা ভাল লেগেছিল গ্রুপ টা দেখে। বেশ ছিমছাম ছোট্ট একটা গ্রুপ, আমায় নিয়ে বোধহয় গ্রুপের সদস্য সংখ্যা পাঁচ কি ছয় হবে। সবাই কবিতা লেখে, গল্প করে আর মোটামুটি সবই শিলচরের। একটা মুচকি হাসি ছাড়া আর কোন কার্পণ্য করিনি বন্ধুতে যোগ দিতে। আর সেই শুরু এক স্বপ্নের পথ চলা। বিদেশ বিভূঁইয়ের এক ঘেয়েমি জীবনে “বন্ধু” কখনও তরমুজের লাল ডগা তো কখনও গরম গরম ভাজ্জি, পকোড়া। শতদল দা (শতদল আচারজী), গৌরব (গৌরব চক্রবর্তী), চন্দ্রানি (চন্দ্রানি পুরকায়স্থ), অয়িঋদ্ধি (অয়িঋদ্ধি ভট্টাচার্য), জাহির (জাহির জাকারিয়া) আর ধীরে ধীরে আসা নতুন কিছু বন্ধু নিয়ে সে এক জমজমাট আড্ডা। প্রায় রোববারে বসত কিছু বিশেষ আড্ডা, কখনও ছড়ার, তো কখনও কবিতার, আর মাঝে মাঝে গল্পের। “আগামী রোববার সকাল দশটা থেকে ছড়ার আড্ডা থাকলে কেমন হয় বন্ধুরা?”, গৌরবের এমন উদ্যোগমূলক স্ট্যাটাসে সবাই বুঝে যেত যে এক জমজমাট আড্ডায় আসছে রোববার হবে পার। আর যে যার জায়গা থেকে নানান কমেন্ট আর লাইক দিয়ে যে সেদিনই এক আড্ডার সূচনা করে দিত তাঁর খেয়াল হয়ত হতো কিছুটা পরে।  আমি দশটার ট্রেন ধরব বলে দুদিন আগে থেকেই মনে মনে প্রস্তুত থাকতাম, আর আড্ডার দিন নির্ঘাত মিস হতো আমার রাইট টাইমের ট্রেন। এক ঘণ্টা পরে যখন আমি আড্ডায় যোগ দিতাম, তখন দেখতাম ট্রেন তাঁর নির্দিষ্ট প্যাসেঞ্জার নিয়ে মোটামুটি গতিতে এগিয়ে চলছে। দেরীতে আসার একটা অনুনয় সূচক ছড়া দিয়ে যখন ট্রেনে চাপতাম তখন আড্ডার গতি টা হঠাত ই দিক পরিবর্তন করে আমাকে কেন্দ্র করে নিত। আর আমি এই ফাঁকে এ অব্ধি আসা সফরের মোটামুটি গ্যান নিয়ে নিতাম।  তারপর আর আমাদের থামায় কে? একের পর এক ছড়া, টিপ্পনী আর কিছু অকৃত্রিম অদ্ভুত ভালোলাগা মিশ্রিত হরেক রকমের মিষ্টি মুচকি হাসিতে দুপুর গড়িয়ে কখন যে শেষ বিকেলে পৌঁছুত আমাদের আড্ডার ট্রেন টেরই পাওয়া যেত না।
আমাদের এরকম অনেক আড্ডার এক মধ্যমণি ছিল যার লেখালেখি থেকে বেশি আগ্রহ ছিল আমাদের লিখা ছড়া, কবিতা গুলো পড়ার আর  আমাদের উৎসাহ বাড়িয়ে দেবার। সে নিজে লিখতনা ঠিকই কিন্তু আমাদের লেখালেখিতে আপাদমস্তক নজর থাকত তাঁর। আমার ছড়াগুলোর প্রতি তাঁর একটা আলাদা ভাব ছিল। প্রায়ই আমার ছড়ার তারিফ করত ফেসবুক মেসেঞ্জারে। মাঝে মাঝে আড্ডায় ওকে না পাওয়া গেলে আমরা সবাই বলাবলি করতাম ওর কথা। পরে সে নিজেই জানান দিত তাঁর অনুপস্থিতির কারণ। কখনও ইউনিভার্সিটির কোন এসাইন্মেন্ট নিয়ে ব্যস্ত তো কখনও দুপুর বেলায় মায়ের সাথে আলুর দম নিয়ে। খাবার দাবার নিয়ে আমাদের মাঝে প্রায়ই বেশ গম্ভির আলোচনা হতো। আমি রোববারের দুপুরের মাসিমার হাতের রান্না আর নানান ব্যঞ্জন শুনে সুদুর বাঙ্গালোর থেকে জিভে জল আসার কথা বলতে ও বলত শিলচর এলে একবার ওদের ঘর ঘুরে যেতে। আমি মাঝে মাঝে আপনি বলে সম্ভোদন করলে ও বিরক্ত হয়ে বলত, “দাদা, তুমি আমাকে “তুমি” বলেই ডাকবে”। এভাবেই বেশ একটা মিষ্টি সম্পর্ক ছিল আমাদের মাঝে। ও ছড়া ভালোবাসতো তাই মাঝে মাঝে আমি ছন্দে ওর সাথে কথা বলতাম, যখন ছন্দালাপ দীর্ঘ হয়ে যেত তখন ও বলত, “দাদা, আর পারছিনে”, আমি তখন অনেক কষ্ট করে আমার ছন্দের ভেলায় ব্রেক কষতাম। দেখতে দেখতে বন্ধুতে আমার বয়স বছরে গড়ালো, “বন্ধু” আর বন্ধুর এ’কজন বন্ধু হয়ে ওঠলো আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ফেসবুকে লগিন করেই বন্ধুর পেজে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধুতে বন্ধুদেরে নিয়ে। এ যেন এক মায়াপুরি, কিছুতেই বেরিয়ে আসতে চাইতো না মন। অফিসে গেলেও মন লেগে থাকত বন্ধুতে। বাঙ্গালোরের দিন গুলো এভাবেই কাটতে থাকলো।
তারপর এক মার্চের দুপুর নিয়ে এলো আমার জীবনের এক অবিশ্বাস্য দুঃখের সংবাদ। আমার একমাত্র বোনের মৃত্যুর খবরটা মুহূর্তের মধ্যে এলোমেলো করে দিল আমাদের জীবনটাকে। ফ্লাইট মিস করে শেষবারের মত একবার দেখতে ও পারিনি বোনটাকে। পরের দিন সন্ধায় যখন বাড়ি পৌঁছই ঘর ভর্তি আত্মীয়ের সমাগম আর তারই মাঝে আমার মা ড্যাব ড্যাব চোখে উপরের দিকে তাকিয়ে আছেন। সপ্তা দুয়েক পরে কাজের উদ্দেশে আবার বাঙ্গালোর পাড়ি দিতে হল। সবকিছু কেমন অবিশ্বাস্য লাগছিলো। অফিসে প্রায়ই কান্না আসতো, একা একা কাঁদতাম। কলিগ রা দেখে সান্ত্বনা দিতে আসতো। ঘরে ফিরে বন্ধুতে ডুবার চেষ্টা করতাম, কিন্তু সেখানেও বার বার বোনের কথা মনে পড়তো। ফেসবুকের বন্ধুদের সেই  অ-কবি মধ্যমণি আমার দুঃখের সংবাদ টা শুনে সেদিন ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলো। সে ও ছিল দু ভাইয়ের মাঝের বোন। আমাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেই অশান্ত হয়ে পড়তো, আমার মায়ের কথা চিন্তা করতো, তিনি কি করছেন। তাঁর কি হবে এসব। ধীরে ধীরে সময় গড়াতে থাকলো, আমার বাঙ্গালোরের জীবনে ইতি টেনে আমি এক নূতন শহরে, নূতন এক কোম্পানিতে। কোম্পানির গেস্ট হাউসে হপ্তা খানেক থেকে বের হলাম ঘর খুঁজতে। আর ছ বছরে এই প্রথম আবিষ্কার করলাম পৃথিবীটা কত গরম হতে পারে আর তাঁর থেকে কত চরম হতে পারে এমন গরমে থাকার জন্য একটা ঘর বের করা। যাইহোক মাদ্রাজে শেষ পর্যন্ত একটা ঘর জোগাড় হল আমার। নতুন শহর, নতুন ঘর, নতুন ভাষা, সবকিছুই নতুন। আর এই নতুনের ভিড়ে বারবারই পুরনোদের কথা মনে আসতো। মাদ্রাজে প্রায় মাসদিন পর ইন্টারনেট কানেকশনের ব্যবস্থা হল আর লগিন করেই সোজা বন্ধুতে আর গিয়েই আমার সেই আড্ডার মধ্যমণি। ওকে পেয়ে সেদিন কি খুশি। প্রান খুলে কথা হল ওর সাথে। মাদ্রাজে গিয়ে এই প্রথম যেন একটা সস্থির শ্বাস ফেললাম। ধীরে ধীরে আবার সব বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হল। জীবনটা ধীরে ধীরে সহজ হতে লাগলো।
তারপর অনেক গল্প আমার জীবনে, সে না হয় আরেকদিন বলা হবে। সেদিন আবার ও হঠাত করে জাহিরের ফোন। আমার থাকা তখন করিমগঞ্জে। “অপুদা, একটা দুঃখের সংবাদ দিতে তোমাকে ফোন করেছি, অয়িঋদ্ধি দি আমাদের মাঝে আর নেই”। আমি নির্বাক কিছুক্ষণ থেকে জাহিরের কাছে শুনতে পেলাম ওর রোগের কথা। বাড়ি ফিরে মাকে বললাম। আর মা সারাটা দিন বার বার ভাবছিল ওর মায়ের কথা, ওর ঘরের প্রতিটি কোনে ওর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কথা, ঘরময় মা’র মেয়ের লেগে থাকার কথা। মায়েরা এমনই হয়, ওদের কলেজা রক্তাক্ত হয় এমন ঘটনায়। আর আমার মত ভায়েরা দিশেহারা হয় এমন বোনের বিচ্ছেদে।

পৃথিবীতে এমন শত শত ঘটনা আকসারই হচ্ছে, কিন্তু এমন কষ্ট বঝে শুধু তাঁরাই যাদের সাথে এমন হয়। আফসোস  আমরা যদি বুঝতাম বা বুঝার চেষ্টা করতাম যে আমরা কেনই বা এলাম, করছিটা বা কি আর যাবোটাই বা কোথায়। 

Saturday, July 20, 2013

এমনি এমনি...

"কাইলকুর ছাগি, ভাত রে কয় অন্ন"- এমন কথা প্রায়ই শুনতাম। আর আমার আব্বা ও আমাকে মাঝে মাঝে বলতেন। এই যেমন আব্বা কিছু একটা করলেন আমার তা পছন্দ হল না, উঠতি বয়স, কৈশোর কে সবে বিদেয় জানিয়েছি, দিলাম বলে কিছু একটা। ব্যস, শুরু হয় গেলো আব্বার শব্দবাণ, আমি জর্জরিত হওয়ার আগেই ঘর থেকে হাওয়া। বুঝলাম যে শুরু হয়ে গেছে, পালিয়ে বাচি, আর পালাতে পালাতে যে গুলো কানে আসতো তাঁর মধ্যে ছিল এটা ছিল অন্যতম। আর ও কিছু ছিল যেমন "মুতর গন্ধ গেসে না, দেখরায় নি ঝেং" প্রকারের বেশ মজার মজার শ্লোক। আমার অবশ্য এগুলোর কোনটাই গায়ে লাগতো না বরং উলটো ভালো লাগতো। এই প্রবাদ গুলো নিয়ে ভাবতাম কিভাবে এগুলোর জন্ম হল আর কে ই বা প্রথম ব্যবহার করল। ভাবা ভাবি গুলো বেশি দূর গড়াবার আগেই জুটে যেতো আরও হাজারো উল্লেখযোগ্য ব্যস্ততা, যেমন পাড়া ক্রিকেট, বিকেলের আড্ডা এবং অনেক কিছু। তারপর আবার সেই রোজকার রুটিন।

সে রুটিনের ছুটি আজ প্রায় দশ বছর। নেই সেই কথার কামান, নেই সেই অফুরন্ত আড্ডা আর ক্রিকেটের ময়দান। এখন যখন নিজের পায়ে দাড়িয়ে, বুঝি সেদিনের মর্ম আর সাথে এও বুঝি যারা আমাদের কথা শুনাতেন তাঁদের কি পরিশ্রম আর খাটুনি আমাদের পেছনে। আজ কদিন থেকে ঘরে একা, রান্না ঘরের বেসিনে বাসন প্রায়ই এঁটো থাকে, কালকে ধোব বলে বলে কালকে টা বেশ দেরি করে ফেলে আসতে। আর যখন রান্নার জন্য বাসন অবশিষ্ট থাকে না তখন 'কালকে' টা চট করেই 'এখন' হয়ে যায়। কিন্তু এই বাসন ধোয়া টা কিন্তু কম পরিশ্রম নয় এখন বুঝি, দাড়িয়ে দাড়িয়ে ধোয়াতে পাঁচ মিনিটের বেশি হলেই কোমরে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। অথচ ঘরে আমার মা সারা জীবন তো বাসন ধুয়েই গেলেন, তাঁর উপর আমাদেরকে খাওয়ানো, পড়ানো, স্কুল করা সবকিছুই তো করলেন, কিন্তু কই কোনদিন তো জিজ্ঞেস ই করিনি, মা তোমার কি পিঠে ব্যথা হচ্ছে? এখন মা কে ফোন করে বলি, বাসন ধোয়ার মত কষ্ট তো আর কিছুই নেই, তুমি কিভাবে করলে এতকাল? মা হাসেন, বলেন ধুর, অভ্যাস হয়ে যায়।

আজ তাই মনে হল আমি আমার সকল বন্ধুদেরে বলি, আমাদের ঘরে যাদের মা, বোন, বউ আছে তাঁদের অন্তত সপ্তাহে এক বার হলে ও ঘরের কাজে হাত বাড়াই। দিয়েই দেখি না একদিন ছুটি, না আজ তোমাদের রাঁধতে হবে না, বাসন মাজা, কাপড় কাঁচা সব আমরাই করবো। তারপর সুযোগ পেলে না হয় ফেসবুকে আসবো, না হয় আসবো না, একদিনে আর কি আসে যায় ফেসবুকের? কি পারবো না এমন করতে??

২১শে জুলাই, ২০১৩

মাদ্রাজ

Saturday, April 13, 2013

ফিরে দেখা...


অসংখ্য ছোটো ছোটো মশার প্রেকটিক্যাল চলছিল, লাশকাটা ঘরে একা আমি। পায়ের দিকে অস্বাভাবিক মনোযোগ আর ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথড লাশটাকে খাড়া করতে যথেষ্ট ছিল। আর তখনি ভুত কিংবা উলঙ্গ পাগল দেখলে দৌড়াদৌড়ি আর ঢিল মেরে খোঁচাবার আদিম প্রয়াসে মেতে উঠলো সারা তামিল মশারা। লক্ষণীয় যে এদের গানের সুর হুবহু আমাদের সিলেটী স্বজাতিদের মতই। আমি নৈরিতে ক্ষেপে গেলে ঈশান, অগ্নি, বায়ু থেকে ত্রিমুখী হামলা, আর বসলে মুখ ভেংচিয়ে অট্টহাসির সাথে মুখের তওয়াফ। মনে হল ওদের দলবদ্ধ আক্রমণের নির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য নেই বা এখন ও আসেনি ওদের কাছে, তাই “যত পারো খেপিয়ে তোল শ্যালাকে” মন্ত্রে দীক্ষিত ওই তরুন হামলা বাজদের হামলায় করুন হয়ে বসে বসে ভাবছি সেহরির কথা।

নাম না জানা বাইং মাছের মত এক জাতিও তামিল মাছ দিয়ে ফরাশি বিচির ঝোল বানাবো বলে আড়াইটার অ্যালার্ম লাগিয়ে শুয়েছিলাম ক্লান্ত চোখে ঘুমের কুঁড়ি নিয়ে, কলি হয়ে ফুল ফুটার আগেই সব ছারখার। ঘুম পালিয়েছে জানলা দিয়েএখন ও প্রায় তিন ঘণ্টা বাকি সেহরি শেষ হতে

এখানে সেহরির জন্য মসজিদ থেকে কেউ ডাকে না বা ডাকলেও শুনা যায় না আর শুনলেও কিছু বুঝা যাবে না। তাই ওই ডাকের অপেক্ষা বেশ যুক্তি সঙ্গত নয়সময়ের গলা চেপে হত্যা করা তো আমার নিত্যদিনের কাজ, তাই এই কাজ টা না হয় আজ আরেক দিন হল, কি ক্ষতি? এক খুনের যে সাজা, সাত খুনের ও সেই সাজা। আর সময় কে হত্যা কর আর কাজে লাগাও, কথা তো এক ই, সময় চলে যায়, বেঁধে রাখা যায় না। আমি কত ভালবেশেছি ওই সময়কে, কিন্তু কই সে তো আমায় পাত্তাই দিল না আমাকে কখনও বলে ও নি যে ও চলে যাবে। নইলে সব শক্তি দিয়ে বেঁধে রাখার চেষ্টা করতাম সেই সেহরি করার দিন গুলো কে।

শীতকালের রোজা, ভোর তিনটে থেকে আমার এক নানার মসজিদে মধুর সুরের গজল আর অতি সাহিত্যিক ভঙ্গীতে গ্রামবাসীকে ডাকার সেই মধুর স্মৃতি এখনও মন কে নাড়া দেয়বাজিলো কি রে ভোরের ও সানাই, নীদ মহলার আঁধার ও রাতে...” গান টা শুনলেই ওই নানার কথা মনে পড়ে। তখন রোজা রাখার খুব শখ ছিল, যদি ও ফর্য হয় নি তখন ও। সেহরিতে সবার সাথে উঠে ঠাণ্ডার মধ্যে সেহরি খাওয়ার মজা টাই ছিল অন্যরকম। বাড়ির সব ঘরে আলো জ্বলছে মধ্যরাতে, কুয়াশা আর ঝির ঝির বাতাসে টুং টাং বাসনের আওয়াজ, টুকটাক বার্তালাপ আর মসজিদ থেকে কখনও সেই নানা বা ইমাম সাহেবের মধুর সুরের গজলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রইতাম। সেহরি শেষে ফজরের নামাজে আমার প্রিয় বন্ধুকে দেখে আরও উৎফুল্ল হতাম। নামাজ শেষে সবাই যখন ঘরমুখি, আমরা তখন ঠাণ্ডার মধ্যে দাড়িয়ে বা বসে গল্পে মেতে উঠতামকত যে গল্প হতো... তারাবিহির নামাজে মানুষের দলবদ্ধ যাত্রা তো সত্যিই কাব্যিক লাগতো আমার কাছে। ইফতার পর্ব শেষ করে আরও কিছু সময় পর ছাঁদে গিয়ে বসে থাকতাম গ্রামের লোকদের তারাবিহিতে আসা দেখতে। বয়স্ক আর কচি কাঁচার ছোটো ছোটো দল নানান গল্পে মেতে মেতে বাড়ির সামনে দিয়ে যেত। আমাদের ঘরের সামনেই এক উঠোন আর তারপর মসজিদে যাওয়ার পথ, আর তারপরেই পুকুর। পুকুরপাড়ে আরও কিছু গাছের সাথে একটা নারকেল গাছ আর ওই নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দূর আকাশে আমার এক প্রেয়সী পূর্ণিমার চাঁদ। যেন এক স্বপ্নিল যাত্রার লাইভ টেলিকাস্ট দেখতাম। বয়স্ক লোকেরা চাঁদর মুড়ি দিয়ে পান খেতে খেতে যেত আরা ছোটদের দল আগামীকালের ক্রিকেট ম্যাচের পরিকল্পনায় মশগুল থাকতো। আমাদের ওই সামনের উঠোন টা ও ছিল গ্রামের কয়েকটা মাঠের একটা। সবাই ঘুমিয়ে থাকতো বলে সকালে নাগাড়ে প্রায় চার/পাচ টা ম্যাচ হয়ে যেত।  যাইহোক, ওই সব দেখে আমি যখন মসজিদে পৌঁছতাম তখন নামাজ প্রায় শুরু ই হয়ে যেত। আমরা ছোটো ছিলাম তাই পেছনের সারিতে থাকতামআমার বয়সি যদি ও আরও অনেক ছিল কিন্ত আমি সবার সাথে বেশ মিশতে পারতাম না, তাই আমি মনে মনে আমার সেই বন্ধুকে খুঁজতাম আর দেখা পেলে দুজনেই মুচকি হাসি দিয়ে জায়গা বদল করে একসাথে থাকতাম। সবচেয়ে বেশি মজা হতো ইমাম সাহেবদের টিফিন পেলে, খুলে দেখতাম কি কি আছে, আর সুবিধা হলে খুলে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ করতাম, সে ছিল ইফতার শেষের বেঁচে যাওয়া জিলেপি, খেজুর আর ডালের বড়া। আমাদের থেকে ছোটো কেউ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলে চোখ রাঙাতাম আর তারপর ভদ্র ছেলের মত আবার নামজে যোগ দিতাম। নামাজ শেষে এক মায়াবি জোছনায় সারা মসজিদ প্রাঙ্গন এক অপরূপ রূপ নিত, দূর আকাশের ওই ছাঁদে দেখা চাঁদ এখানেও যেন আমার চোখাচোখির অপেক্ষায়। আমি উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে সবার মাথার উপর দিয়ে বাশ ঝাড় আর সুপারি গাছের ফাঁকে ফাঁকে সেই চাঁদের সাথে চোখ মেলাতাম আর চাঁদ টা ও যেন আমার চাহনিতে মুগ্ধ হয়ে আরও আলো ছড়াত চারিদিকে।  চোখাচোখি পর্ব শেষে যখন নিচে ফিরতাম, দেখতাম ৫/৬ জনের ছোটো ছোটো বিভিন্ন বয়সি দল বিছিন্ন ভাবে আলাপ আলোচনায় মশগুলগ্রামের সবার এক মিলনভুমিতে পরিণত হওয়া সেই মসজিদ প্রাঙ্গন, যেখানে একে অন্যের খবরাখবর নিচ্ছে আর শীতের রাতের এক বেহেশতই হিমেল হাওয়া সবাইকে যেন পবিত্র করে তুলছে।

এখন সেই বয়স্কদের দলের প্রায় কেউ ই নেই, সবাই কবরবাসি, কচিকাচার দল গুলো বেশ বড় হয়ে গেছে। আমি আমার সেই বন্ধুকে ফোনে প্রায় ই জিজ্ঞেস করি এখনকার রোজা, তেরাবিহির কথা। ও দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে, বলে “নেই রে, আগের মত কিছুই নেই, সব বদলে গেছে, এখন আর সেই দল বেঁধে মসজিদে আসা নেই, নেই সেই মিষ্টি কথোপকথন, সব্বাই ব্যস্ত এখন। কারুর ই সময় নেই, মানুষ গুলো সব কেমন যান্ত্রিক হয়ে গেছে, শুধু ওই চাঁদটা মাঝে মাঝে খুঁজে বেড়ায় কিছু চেনা মুখ আর না পেলে মেঘের আড়ালে মুখ লুকায়”

২৯ জুলাই, ২০১২ 

কুশীলব


সে প্রায় পনেরো কুঁড়ি বছর আগের কথা। আমরা তিন ভাই বোন, আমি, পপি আর তপু। বিনোদন বলতে বড় চাচার ঘরের টিভি তে বাংলা নাটক আর মাঝে মাঝে সিনেমা। বেশি ঝোঁক টা ছিল নাটকের প্রতি। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি, টিভি বলতে “বিটিভি” বাংলাদেশ টেলিভিশন। যেহেতু তখন এপারে “ডি ডি ওয়ান” ছাড়া আর কিছুই ছিল না তখন আর অপারে “বিটিভি”, আর আমাদের বাড়িটা ও একদম কুশিয়ারার কাছাকাছি, তাই টিভি খুললেই বিটিভির পর্দা টা আসতো সুন্দর ঝকঝকে, “ডি ডি ওয়ান” টা ছিল একটু ঝাপসা। আর সেই হেতু আমাদের প্রথম টিভি ই ছিল বিটিভি।

“এক সাগর ও রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না...” গানটার সুরে যখন “রাত আট টার বাংলা সংবাদ” শুরু হতো তখন সবার ই অপেক্ষা থাকতো কবে খবর শেষ হবে আর  আমদের প্রিয় নাটক শুরু হবে। ততক্ষনে যার যার পছন্দের জায়গা বেছে নিয়ে আমরা বসে আছি। দর্শক বলতে  আমরা তিনজন, বড় চাচার তিন মেয়ে, খালাম্মা আর মাঝে মাঝে আমদের আব্বা ও মা। খবরের মাঝখানে আমরা টিভির বিজ্ঞাপন গুলো নিয়ে আলচনা করতাম, কার কোন টা ভালো লাগে। “বউরানি প্রিন্ট শাড়ির” ঘরের খবর পরে জানলো কেমনে, এই যে এমনে, কিংবা “রূপসা রূপসা রূপসা, নরম নরম হাওয়াই চপ্পল রূপসা” আবার কখন ও “মাছের রাজা ইলিশ আর বাত্তির রাজা ফিলিপ্স” চিৎকারে যখন ঘর টা তুলে ধরতাম তখনি হটাত খালাম্মা বলে উঠতেন ঐ দেখ “পানি এ কিতা করসে” আর আমরা হা করে তাকিয়ে দেখতাম বন্যার জলে টাইটুম্বুর বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সেই নাম গুলো এখন ও আমার কানে বাজে, গাজিপুর, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চাপাই নবাবগঞ্জ, মীরপুর, মাদারিপুর, ফেনী, ভোলা, কিশরগঞ্জ, ময়মনশিঙ এর অনেক গ্রাম জলে প্লাবিত। লোকগুলো কাঁথা, বালিশ, কলসি, আর বেতের তৈরি ঝুড়ি তে মোরগ ছানা ইত্যাদি নিয়ে ভেলায় চেপে যাচ্ছে, করুন মুখ হা করে তাকিয়ে আছে কেমেরার পানে। বন্যায় ওদের দুর্গতি আমার একটু ও খারাপ লাগতো না, আমার খুব ই ভালো লাগতো, আমি ও হা করে তাকিয়ে থাকতাম টিভির পানে। কলকল বেয়ে চলত নৌকো, আর আমি ও ডুব দিতাম স্বপ্নে, ইশ আমি ও যদি এরকম নৌকোয় থাকতাম।

ত্রান বণ্টন এর খবর সহ আরও কিছু খবরের পর যখন দেখতাম আবাহনী আর ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং এর গোলের খবর দিতে দিতে “আগামি চব্বিশ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাষ” শুরু হয়ে গেছে, তখন বসা টাকে আরেক টু যুত করে নিতাম আর খেয়াল রাখতাম যাতে বাকিদের স্বর টা একটু নিচে নেমে আসে। কারুর জল  তেষ্টা বা অন্য কিছু পেলে এক দৌড়ে গিয়ে সেরে আসতাম। খবর শেষ হওয়ার পর দু একটা বিজ্ঞাপনের পর ই এক হাস্যজ্জল রমণী ঘোষণা দিতেন একটু পরেই দেখবেন ধারাবাহিক নাটক...কিংবা ইদ উপলক্ষে বিশেষ নাটক... বোনেরা ঐ রমনীর সাজগোজ নিয়ে একটু আধটু আলোচনা সেরে নিত ঐ ফাঁকে, যেখানে আমার আর তপুর একটু ও কনট্রিবিউশন থাকতো না। মনে মনে ভাবতাম ঐ মহিলা বোধ হয় শুধু আমাদেরকেই নাটক দেখার মিষ্টি নিমন্ত্রন টা দিয়ে গেলেন।

এবার শুরু, সব চুপচাপ বসে আছি। এক এক করে অভিনেতা-নেত্রিদের নাম দিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা গড় গড় করে সব নাম পড়ে যাচ্ছি। ওরা যেন আমাদের চির পরিচিত আপনজন। আবুল হায়াতের নাম আসতেই সবাই বলে উঠতাম “কাশেম আলি”, ওই নাম দিয়েই যে আমাদের কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এক বিশাল নাট্য শিল্পীর, নাট্যকার হুমায়ুন আহমদ। তারপর একে একে বাকি নাম গুলো আসতো...আসাদুজ্জামান নুর (আনিস ভাই/ বাকের ভাই), হুমায়ুন ফরিদি (কান কাটা রমজান),  জাহিদ হাসান, আজিজুল হাকিম, টনি ডায়েস, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়...ফেরদৌসি মজুমদার (হুরমতি),সুবর্ণা মোস্তফা, শমি কায়সার, বিপাশা হায়াত, তারানা হালিম, বিজরী বকতুল্লাহ, আরও অনেক। সব্বার সাথে যেন আমাদের রক্তের পরিচয়। আমাদের পরিচিত সব শিল্পীদের দেখে আমাদের ও খুশির সীমা নাই, সবার ই মুখে মুচকি হাসি। কিন্তু একটা নাম আমাদের কারুর ই জানা ছিল না, প্রতিটা নাটকের প্রথমেই আসতো নামটা, কুশীলব। আমারা নিজের নিজের মত করে খুঁজে বেড়াতাম, কার নামটা হতে পারে কুশীলব? এক এক করে প্রায় সব্বাইকে ই তো চিনি, তবে এই কুশীলব টা কে? উত্তর আমরা কেউ ই পেতাম না, আর ভাবতাম হতে পারে কেউ একজন কুশীলব, যিনি প্রায় সব নাটকেই অভিনয় করেন। তারপর একদিন আব্বা কথাটা শুনতে পেরে বললেন, কুশীলব হচ্ছে, যারা যারা আভিনয়ে আছেন তাদেরকে কুশীলব বলা হয়। আর এক মহা উল্লাসে বোকার মত আমারা সবাই সেই অজানা চরিত্রটাকে চিরদিনের জন্য বিদায় দিলাম।

এরকমই হাসির স্রোতেই কেটে গেল জীবনের সেই সোনালি দিনগুলো। কত নাটক দেখা হল, অয়ময়, সংসপ্তক, বহুব্রীহি, কথাও কেউ নেই, স্বপ্নের শহর, আজ রবিবার, আরও কত নাটক, ইদ উপলক্ষে বিশেষ নাটক।।  নাটকগুলোর ডায়লগ ও মনে থাকতো অনেক কাল, এখন ও আছে কিছু কিছু।  “সে এক বিরাট ইতিহাস”, কিংবা “আমি হইলাম নেত্রকোনার পোলা, থুথু রে কই ছেপ” এবং এমন অনেক যা এখন ও ভীষণ ভাবে মনে পড়ে।

এই তো সেদিন, ২০১০ এর প্রথম দিকে যখন ল্যাপটপ টা কিনলাম, ইউ টিউব এ গিয়েই সেই নাটক গুলোর নাম স্মরণ করে করে খুঁজতাম, দেখে আনন্দ হতো, বাড়িতে ফোন করে বলতাম, মা বলতেন তোর এখন ও মনে আছে? তারপর বোনের সাথে শেয়ার করতাম নাটক গুলোর টুকরো টুকরো ঘটনা...

আজ আমার সেই বোন টি ও নেই। আর ওই অবিস্মরণীয় নাটক গুলোর রচয়িতা সেই হুমায়ুন আহমদ ও নেই।

২৩ জুলাই, ২০১২