Saturday, April 13, 2013

ফিরে দেখা...


অসংখ্য ছোটো ছোটো মশার প্রেকটিক্যাল চলছিল, লাশকাটা ঘরে একা আমি। পায়ের দিকে অস্বাভাবিক মনোযোগ আর ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথড লাশটাকে খাড়া করতে যথেষ্ট ছিল। আর তখনি ভুত কিংবা উলঙ্গ পাগল দেখলে দৌড়াদৌড়ি আর ঢিল মেরে খোঁচাবার আদিম প্রয়াসে মেতে উঠলো সারা তামিল মশারা। লক্ষণীয় যে এদের গানের সুর হুবহু আমাদের সিলেটী স্বজাতিদের মতই। আমি নৈরিতে ক্ষেপে গেলে ঈশান, অগ্নি, বায়ু থেকে ত্রিমুখী হামলা, আর বসলে মুখ ভেংচিয়ে অট্টহাসির সাথে মুখের তওয়াফ। মনে হল ওদের দলবদ্ধ আক্রমণের নির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য নেই বা এখন ও আসেনি ওদের কাছে, তাই “যত পারো খেপিয়ে তোল শ্যালাকে” মন্ত্রে দীক্ষিত ওই তরুন হামলা বাজদের হামলায় করুন হয়ে বসে বসে ভাবছি সেহরির কথা।

নাম না জানা বাইং মাছের মত এক জাতিও তামিল মাছ দিয়ে ফরাশি বিচির ঝোল বানাবো বলে আড়াইটার অ্যালার্ম লাগিয়ে শুয়েছিলাম ক্লান্ত চোখে ঘুমের কুঁড়ি নিয়ে, কলি হয়ে ফুল ফুটার আগেই সব ছারখার। ঘুম পালিয়েছে জানলা দিয়েএখন ও প্রায় তিন ঘণ্টা বাকি সেহরি শেষ হতে

এখানে সেহরির জন্য মসজিদ থেকে কেউ ডাকে না বা ডাকলেও শুনা যায় না আর শুনলেও কিছু বুঝা যাবে না। তাই ওই ডাকের অপেক্ষা বেশ যুক্তি সঙ্গত নয়সময়ের গলা চেপে হত্যা করা তো আমার নিত্যদিনের কাজ, তাই এই কাজ টা না হয় আজ আরেক দিন হল, কি ক্ষতি? এক খুনের যে সাজা, সাত খুনের ও সেই সাজা। আর সময় কে হত্যা কর আর কাজে লাগাও, কথা তো এক ই, সময় চলে যায়, বেঁধে রাখা যায় না। আমি কত ভালবেশেছি ওই সময়কে, কিন্তু কই সে তো আমায় পাত্তাই দিল না আমাকে কখনও বলে ও নি যে ও চলে যাবে। নইলে সব শক্তি দিয়ে বেঁধে রাখার চেষ্টা করতাম সেই সেহরি করার দিন গুলো কে।

শীতকালের রোজা, ভোর তিনটে থেকে আমার এক নানার মসজিদে মধুর সুরের গজল আর অতি সাহিত্যিক ভঙ্গীতে গ্রামবাসীকে ডাকার সেই মধুর স্মৃতি এখনও মন কে নাড়া দেয়বাজিলো কি রে ভোরের ও সানাই, নীদ মহলার আঁধার ও রাতে...” গান টা শুনলেই ওই নানার কথা মনে পড়ে। তখন রোজা রাখার খুব শখ ছিল, যদি ও ফর্য হয় নি তখন ও। সেহরিতে সবার সাথে উঠে ঠাণ্ডার মধ্যে সেহরি খাওয়ার মজা টাই ছিল অন্যরকম। বাড়ির সব ঘরে আলো জ্বলছে মধ্যরাতে, কুয়াশা আর ঝির ঝির বাতাসে টুং টাং বাসনের আওয়াজ, টুকটাক বার্তালাপ আর মসজিদ থেকে কখনও সেই নানা বা ইমাম সাহেবের মধুর সুরের গজলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রইতাম। সেহরি শেষে ফজরের নামাজে আমার প্রিয় বন্ধুকে দেখে আরও উৎফুল্ল হতাম। নামাজ শেষে সবাই যখন ঘরমুখি, আমরা তখন ঠাণ্ডার মধ্যে দাড়িয়ে বা বসে গল্পে মেতে উঠতামকত যে গল্প হতো... তারাবিহির নামাজে মানুষের দলবদ্ধ যাত্রা তো সত্যিই কাব্যিক লাগতো আমার কাছে। ইফতার পর্ব শেষ করে আরও কিছু সময় পর ছাঁদে গিয়ে বসে থাকতাম গ্রামের লোকদের তারাবিহিতে আসা দেখতে। বয়স্ক আর কচি কাঁচার ছোটো ছোটো দল নানান গল্পে মেতে মেতে বাড়ির সামনে দিয়ে যেত। আমাদের ঘরের সামনেই এক উঠোন আর তারপর মসজিদে যাওয়ার পথ, আর তারপরেই পুকুর। পুকুরপাড়ে আরও কিছু গাছের সাথে একটা নারকেল গাছ আর ওই নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দূর আকাশে আমার এক প্রেয়সী পূর্ণিমার চাঁদ। যেন এক স্বপ্নিল যাত্রার লাইভ টেলিকাস্ট দেখতাম। বয়স্ক লোকেরা চাঁদর মুড়ি দিয়ে পান খেতে খেতে যেত আরা ছোটদের দল আগামীকালের ক্রিকেট ম্যাচের পরিকল্পনায় মশগুল থাকতো। আমাদের ওই সামনের উঠোন টা ও ছিল গ্রামের কয়েকটা মাঠের একটা। সবাই ঘুমিয়ে থাকতো বলে সকালে নাগাড়ে প্রায় চার/পাচ টা ম্যাচ হয়ে যেত।  যাইহোক, ওই সব দেখে আমি যখন মসজিদে পৌঁছতাম তখন নামাজ প্রায় শুরু ই হয়ে যেত। আমরা ছোটো ছিলাম তাই পেছনের সারিতে থাকতামআমার বয়সি যদি ও আরও অনেক ছিল কিন্ত আমি সবার সাথে বেশ মিশতে পারতাম না, তাই আমি মনে মনে আমার সেই বন্ধুকে খুঁজতাম আর দেখা পেলে দুজনেই মুচকি হাসি দিয়ে জায়গা বদল করে একসাথে থাকতাম। সবচেয়ে বেশি মজা হতো ইমাম সাহেবদের টিফিন পেলে, খুলে দেখতাম কি কি আছে, আর সুবিধা হলে খুলে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ করতাম, সে ছিল ইফতার শেষের বেঁচে যাওয়া জিলেপি, খেজুর আর ডালের বড়া। আমাদের থেকে ছোটো কেউ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলে চোখ রাঙাতাম আর তারপর ভদ্র ছেলের মত আবার নামজে যোগ দিতাম। নামাজ শেষে এক মায়াবি জোছনায় সারা মসজিদ প্রাঙ্গন এক অপরূপ রূপ নিত, দূর আকাশের ওই ছাঁদে দেখা চাঁদ এখানেও যেন আমার চোখাচোখির অপেক্ষায়। আমি উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে সবার মাথার উপর দিয়ে বাশ ঝাড় আর সুপারি গাছের ফাঁকে ফাঁকে সেই চাঁদের সাথে চোখ মেলাতাম আর চাঁদ টা ও যেন আমার চাহনিতে মুগ্ধ হয়ে আরও আলো ছড়াত চারিদিকে।  চোখাচোখি পর্ব শেষে যখন নিচে ফিরতাম, দেখতাম ৫/৬ জনের ছোটো ছোটো বিভিন্ন বয়সি দল বিছিন্ন ভাবে আলাপ আলোচনায় মশগুলগ্রামের সবার এক মিলনভুমিতে পরিণত হওয়া সেই মসজিদ প্রাঙ্গন, যেখানে একে অন্যের খবরাখবর নিচ্ছে আর শীতের রাতের এক বেহেশতই হিমেল হাওয়া সবাইকে যেন পবিত্র করে তুলছে।

এখন সেই বয়স্কদের দলের প্রায় কেউ ই নেই, সবাই কবরবাসি, কচিকাচার দল গুলো বেশ বড় হয়ে গেছে। আমি আমার সেই বন্ধুকে ফোনে প্রায় ই জিজ্ঞেস করি এখনকার রোজা, তেরাবিহির কথা। ও দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে, বলে “নেই রে, আগের মত কিছুই নেই, সব বদলে গেছে, এখন আর সেই দল বেঁধে মসজিদে আসা নেই, নেই সেই মিষ্টি কথোপকথন, সব্বাই ব্যস্ত এখন। কারুর ই সময় নেই, মানুষ গুলো সব কেমন যান্ত্রিক হয়ে গেছে, শুধু ওই চাঁদটা মাঝে মাঝে খুঁজে বেড়ায় কিছু চেনা মুখ আর না পেলে মেঘের আড়ালে মুখ লুকায়”

২৯ জুলাই, ২০১২ 

কুশীলব


সে প্রায় পনেরো কুঁড়ি বছর আগের কথা। আমরা তিন ভাই বোন, আমি, পপি আর তপু। বিনোদন বলতে বড় চাচার ঘরের টিভি তে বাংলা নাটক আর মাঝে মাঝে সিনেমা। বেশি ঝোঁক টা ছিল নাটকের প্রতি। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি, টিভি বলতে “বিটিভি” বাংলাদেশ টেলিভিশন। যেহেতু তখন এপারে “ডি ডি ওয়ান” ছাড়া আর কিছুই ছিল না তখন আর অপারে “বিটিভি”, আর আমাদের বাড়িটা ও একদম কুশিয়ারার কাছাকাছি, তাই টিভি খুললেই বিটিভির পর্দা টা আসতো সুন্দর ঝকঝকে, “ডি ডি ওয়ান” টা ছিল একটু ঝাপসা। আর সেই হেতু আমাদের প্রথম টিভি ই ছিল বিটিভি।

“এক সাগর ও রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না...” গানটার সুরে যখন “রাত আট টার বাংলা সংবাদ” শুরু হতো তখন সবার ই অপেক্ষা থাকতো কবে খবর শেষ হবে আর  আমদের প্রিয় নাটক শুরু হবে। ততক্ষনে যার যার পছন্দের জায়গা বেছে নিয়ে আমরা বসে আছি। দর্শক বলতে  আমরা তিনজন, বড় চাচার তিন মেয়ে, খালাম্মা আর মাঝে মাঝে আমদের আব্বা ও মা। খবরের মাঝখানে আমরা টিভির বিজ্ঞাপন গুলো নিয়ে আলচনা করতাম, কার কোন টা ভালো লাগে। “বউরানি প্রিন্ট শাড়ির” ঘরের খবর পরে জানলো কেমনে, এই যে এমনে, কিংবা “রূপসা রূপসা রূপসা, নরম নরম হাওয়াই চপ্পল রূপসা” আবার কখন ও “মাছের রাজা ইলিশ আর বাত্তির রাজা ফিলিপ্স” চিৎকারে যখন ঘর টা তুলে ধরতাম তখনি হটাত খালাম্মা বলে উঠতেন ঐ দেখ “পানি এ কিতা করসে” আর আমরা হা করে তাকিয়ে দেখতাম বন্যার জলে টাইটুম্বুর বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সেই নাম গুলো এখন ও আমার কানে বাজে, গাজিপুর, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চাপাই নবাবগঞ্জ, মীরপুর, মাদারিপুর, ফেনী, ভোলা, কিশরগঞ্জ, ময়মনশিঙ এর অনেক গ্রাম জলে প্লাবিত। লোকগুলো কাঁথা, বালিশ, কলসি, আর বেতের তৈরি ঝুড়ি তে মোরগ ছানা ইত্যাদি নিয়ে ভেলায় চেপে যাচ্ছে, করুন মুখ হা করে তাকিয়ে আছে কেমেরার পানে। বন্যায় ওদের দুর্গতি আমার একটু ও খারাপ লাগতো না, আমার খুব ই ভালো লাগতো, আমি ও হা করে তাকিয়ে থাকতাম টিভির পানে। কলকল বেয়ে চলত নৌকো, আর আমি ও ডুব দিতাম স্বপ্নে, ইশ আমি ও যদি এরকম নৌকোয় থাকতাম।

ত্রান বণ্টন এর খবর সহ আরও কিছু খবরের পর যখন দেখতাম আবাহনী আর ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং এর গোলের খবর দিতে দিতে “আগামি চব্বিশ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাষ” শুরু হয়ে গেছে, তখন বসা টাকে আরেক টু যুত করে নিতাম আর খেয়াল রাখতাম যাতে বাকিদের স্বর টা একটু নিচে নেমে আসে। কারুর জল  তেষ্টা বা অন্য কিছু পেলে এক দৌড়ে গিয়ে সেরে আসতাম। খবর শেষ হওয়ার পর দু একটা বিজ্ঞাপনের পর ই এক হাস্যজ্জল রমণী ঘোষণা দিতেন একটু পরেই দেখবেন ধারাবাহিক নাটক...কিংবা ইদ উপলক্ষে বিশেষ নাটক... বোনেরা ঐ রমনীর সাজগোজ নিয়ে একটু আধটু আলোচনা সেরে নিত ঐ ফাঁকে, যেখানে আমার আর তপুর একটু ও কনট্রিবিউশন থাকতো না। মনে মনে ভাবতাম ঐ মহিলা বোধ হয় শুধু আমাদেরকেই নাটক দেখার মিষ্টি নিমন্ত্রন টা দিয়ে গেলেন।

এবার শুরু, সব চুপচাপ বসে আছি। এক এক করে অভিনেতা-নেত্রিদের নাম দিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা গড় গড় করে সব নাম পড়ে যাচ্ছি। ওরা যেন আমাদের চির পরিচিত আপনজন। আবুল হায়াতের নাম আসতেই সবাই বলে উঠতাম “কাশেম আলি”, ওই নাম দিয়েই যে আমাদের কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এক বিশাল নাট্য শিল্পীর, নাট্যকার হুমায়ুন আহমদ। তারপর একে একে বাকি নাম গুলো আসতো...আসাদুজ্জামান নুর (আনিস ভাই/ বাকের ভাই), হুমায়ুন ফরিদি (কান কাটা রমজান),  জাহিদ হাসান, আজিজুল হাকিম, টনি ডায়েস, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়...ফেরদৌসি মজুমদার (হুরমতি),সুবর্ণা মোস্তফা, শমি কায়সার, বিপাশা হায়াত, তারানা হালিম, বিজরী বকতুল্লাহ, আরও অনেক। সব্বার সাথে যেন আমাদের রক্তের পরিচয়। আমাদের পরিচিত সব শিল্পীদের দেখে আমাদের ও খুশির সীমা নাই, সবার ই মুখে মুচকি হাসি। কিন্তু একটা নাম আমাদের কারুর ই জানা ছিল না, প্রতিটা নাটকের প্রথমেই আসতো নামটা, কুশীলব। আমারা নিজের নিজের মত করে খুঁজে বেড়াতাম, কার নামটা হতে পারে কুশীলব? এক এক করে প্রায় সব্বাইকে ই তো চিনি, তবে এই কুশীলব টা কে? উত্তর আমরা কেউ ই পেতাম না, আর ভাবতাম হতে পারে কেউ একজন কুশীলব, যিনি প্রায় সব নাটকেই অভিনয় করেন। তারপর একদিন আব্বা কথাটা শুনতে পেরে বললেন, কুশীলব হচ্ছে, যারা যারা আভিনয়ে আছেন তাদেরকে কুশীলব বলা হয়। আর এক মহা উল্লাসে বোকার মত আমারা সবাই সেই অজানা চরিত্রটাকে চিরদিনের জন্য বিদায় দিলাম।

এরকমই হাসির স্রোতেই কেটে গেল জীবনের সেই সোনালি দিনগুলো। কত নাটক দেখা হল, অয়ময়, সংসপ্তক, বহুব্রীহি, কথাও কেউ নেই, স্বপ্নের শহর, আজ রবিবার, আরও কত নাটক, ইদ উপলক্ষে বিশেষ নাটক।।  নাটকগুলোর ডায়লগ ও মনে থাকতো অনেক কাল, এখন ও আছে কিছু কিছু।  “সে এক বিরাট ইতিহাস”, কিংবা “আমি হইলাম নেত্রকোনার পোলা, থুথু রে কই ছেপ” এবং এমন অনেক যা এখন ও ভীষণ ভাবে মনে পড়ে।

এই তো সেদিন, ২০১০ এর প্রথম দিকে যখন ল্যাপটপ টা কিনলাম, ইউ টিউব এ গিয়েই সেই নাটক গুলোর নাম স্মরণ করে করে খুঁজতাম, দেখে আনন্দ হতো, বাড়িতে ফোন করে বলতাম, মা বলতেন তোর এখন ও মনে আছে? তারপর বোনের সাথে শেয়ার করতাম নাটক গুলোর টুকরো টুকরো ঘটনা...

আজ আমার সেই বোন টি ও নেই। আর ওই অবিস্মরণীয় নাটক গুলোর রচয়িতা সেই হুমায়ুন আহমদ ও নেই।

২৩ জুলাই, ২০১২